সারাদেশ

টেংগু হত্যাকাণ্ডের পর পলাতক আজা মেম্বার, সীমান্তজুড়ে অপরাধ সাম্রাজ্যের অভিযোগ এলাকাবাসীর

মোঃ খালিদ হাসান ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:৫৫ PM ৮৬২
টেংগু হত্যাকাণ্ডের পর পলাতক আজা মেম্বার, সীমান্তজুড়ে অপরাধ সাম্রাজ্যের অভিযোগ  এলাকাবাসীর

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর সীমান্ত এলাকার আলোচিত ব্যক্তি আজাহার ওরফে আজা মেম্বার। স্বর্ণ চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্রের কারবার, ভারতীয় মাদক, পাতার বিড়ি ও অবৈধ ওষুধের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরের শাসনামলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি সীমান্ত এলাকায় নিজের প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। সম্প্রতি টেংগু হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর পলাতক থাকার খবরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধজগতের নানা অভিযোগ। এদিকে নিহত টেংগুর স্বজনেরা রয়েছেন আতঙ্কে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, টেংগুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আজা মেম্বার দুই বস্তা টাকা নিয়ে পদ্মা নদী পেরিয়ে রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় চলে যান। এ জন্য এক নৌকার মাঝিকে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়া দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন কয়েকজন স্থানীয় মাঝি। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর থেকে আজা মেম্বার আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রামকৃষ্ণপুর সীমান্তে স্বর্ণ চোরাচালান থেকে শুরু করে অবৈধ অস্ত্র, ভারতীয় মাদক, পাতার বিড়ি ও অবৈধ ওষুধের কারবারে আজা মেম্বারের প্রভাব ছিল। তাঁদের দাবি, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আসা এসব পণ্যের ব্যবসা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দৌলতপুরের সাবেক সংসদ সদস্য সরোয়ার জাহান বাদশাহ এবং রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডলের সঙ্গে আজা মেম্বারের ঘনিষ্ঠতা ছিল। এই রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবের কারণেই তিনি দৌলতপুর থানা পুলিশ ও বিজিবিকে উপেক্ষা করে চলতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে ভারতীয় নাগরিক সেন্টু নামের এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার কথাও স্থানীয় সূত্রে উঠে এসেছে। তবে তাঁদের পারস্পরিক যোগাযোগ, চোরাচালানের নেটওয়ার্ক এবং সীমান্তের এপার-ওপারে কারা জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

দৌলতপুরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্রাইম রিপোর্টার জানান, ২০১৯ সালে গোপন সূত্রে স্বর্ণ চোরাচালানের খবর পেয়ে তিনি দৌলতপুর থানা পুলিশের এক কর্মকর্তার সঙ্গে অভিযানে যান। তাঁদের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা একটি ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যান। পরে ওই ব্যাগ থেকে ২৯৯টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

ওই সাংবাদিকের বর্ণনা অনুযায়ী, স্বর্ণ উদ্ধারের পর দৌলতপুর থানায় পৌঁছানোর আগেই একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে তাঁদের ফোন করা হয়। ফোনে কুষ্টিয়ার তৎকালীন আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার বাড়িতে স্বর্ণগুলো পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।

সাংবাদিকের দাবি, নির্দেশ অনুযায়ী ওই নেতার বাড়িতে পৌঁছে তাঁরা সেখানে আজা মেম্বারকে বসে থাকতে দেখেন। এ ঘটনা সীমান্তকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালান এবং তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, স্বর্ণ চোরাচালান ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসাসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আজা মেম্বার বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাঁদের ধারণা, তাঁর সম্পদের পরিমাণ কয়েক শ কোটি টাকা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তকেন্দ্রিক অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক লেনদেন এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এসব বিরোধের সঙ্গে টেংগু হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

নিহত টেংগুর স্বজনেরা দেশ অবজারভারের প্রতিনিধিকে জানান, তাঁরা বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাঁদের আশঙ্কা, আজা মেম্বার যেকোনো সময় তাঁদের ওপর গোপনে হামলা চালাতে পারেন। এ কারণে তাঁরা দ্রুত তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।

এলাকাবাসীর দাবি, টেংগু হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি আজা মেম্বারের বিরুদ্ধে ওঠা চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার অভিযোগও খতিয়ে দেখতে হবে। সীমান্তকেন্দ্রিক অবৈধ বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের মতে, শুধু একজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করাই নয়, সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা অবৈধ ব্যবসার নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে টেংগু হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং নিহতের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ চান স্থানীয় বাসিন্দারা।

সম্পর্কিত খবর